এখনো চলবে দোষারোপের রাজনীতি?
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
আবারো রাজনীতির নোংরা খেলা শুরু হয়েছে। পিলখানায় সেনাকর্মকর্তাদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা যখন হুমকির মুখে, যখন প্রয়োজন ইস্পাতদৃঢ় জাতীয় ঐক্য, তখনো চলছে রাজনীতির নোংরা খেলা। এখনো বিভক্তির ভেদরেখা টেনে ষড়যন্ত্রকারীদের নীলনকশা বাস্তবায়নের পথই সুগম করা হয়েছে। রাষ্ট্রের যখন অস্তিত্বের সঙ্কট, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যখন ভঙ্গুর তখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রাজনীতিকদের দরকার রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা, তখনো নিুমানের অভিযোগমালা উচ্চারিত হচ্ছে। একে হয়তো জনগণের দুর্ভাগ্য বলেই মেনে নিতে হবে। এ-ও এ দেশের মানুষের দুর্ভোগ্যের নিয়তি।
এটা শুরু হয়েছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহী বিডিআর’র সেনাকর্মকর্তাদের হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। হত্যাযজ্ঞ যে শুরু হতে যাচ্ছে সেটা অনুমান করতে পেরেছিলেন অনেকেই। এরকম একটি ভয়াবহ বিপদের কথা আগাম আঁচ পেয়েও তারা কেউ কার্যকর ত্বরিত কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেননি। ফলে এর সমালোচনা তো হবেই।
বিডিআর বিদ্রোহ দমন করতে সরকার কেন দ্রুত সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করল না, তা নিয়ে এখন সব মহলে প্রশ্ন উঠছে। সামরিক এই বিদ্রোহ দমনে ত্বরিত সামরিক ব্যবস্থা নেয়া হলে বহু সেনাকর্মকর্তাকে প্রাণে রক্ষা করা সম্ভব হতো বলে এখন অনেক সমরবিদ ও যুদ্ধবিশারদ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সে ক্ষেত্রে অনেকেই বিদ্রোহ দমনের বিস্তারিত কৌশলও বর্ণনা করেছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে।
যে সেনাবাহিনী প্রধান আগে টেলিভিশনের পর্দায় রাজনীতিকদের নানা ধরনের ছবক দিয়ে বেড়াতেন, তিনি এখন অনেকখানি খামস মেরে আছেন। প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্টভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেনাবাহিনী প্রধান সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণে দীর্ঘ সময় লাগার কথা বলেছিলেন। এটুকু জানা যায়, শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য থেকে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও সেনাপ্রধান থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সরকার কেন দ্রুত ব্যবস্থা নিল না তার ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়েছিল, সে ধরনের ব্যবস্থা নিলে আরো অনেক বেশি প্রাণহানি ঘটত। রক্তপাত এড়ানোর জন্যই সে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। বরং ট্রেড ইউনিয়ন কায়দায় তাদের সাথে ৩২ ঘণ্টাব্যাপী দফায় দফায় আলোচনা করে তাদের যেমন সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে, তেমনি পালিয়ে যাওয়ার পথও করে দেয়া হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডকে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছে। এই ষড়যন্ত্রকারী কারা, কী তাদের উদ্দেশ্য? তদন্ত রিপোর্ট থেকে সেটা বেরিয়ে আসবে কি না এবং শেষ পর্যন্ত জনগণ তা জানতে পারবে কি না এ বিষয়ে ঘোরতর সন্দেহের কারণ ঘটেছে। হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার জন্য এখন যে বিশাল ডামাডোল তার মধ্যেও ঘাতকদের চারজন প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বিমানবন্দর দিয়ে পালিয়ে গেছে বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে এরও কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেয়া হয়নি কিংবা সরকার সংশ্লিষ্ট পত্রিকার এই রিপোর্ট চ্যালেঞ্জও করেনি। তবে কি সরকারের মধ্যেই এমন কেউ আছে যারা ঘাতকদের সহযোগিতা করতে চাইছে? সঙ্গত কারণেই এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। সরকারের তরফ থেকে কালক্ষেপণের পক্ষে আরো একটি যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ দমনের সামরিক ব্যবস্থা নেয়া হলে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত বিডিআর’র মধ্যেও বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটতে থাকত, এতে সারাদেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো।
কিন্তু কোনো সমরবিশারদই সরকারের এ যুক্তি সমর্থন করেননি। কারণ তাদের মতে, এই বিদ্রোহের সূচনাকারীদের তেমন কোনো মনোবলই ছিল না। আর ছিল না বলেই আলোচনার শুরুতেই তারা সাধারণ ক্ষমার আবেদন জানাতে শুরু করেছিল। সরকার কালক্ষেপণের কৌশল গ্রহণ করায় তারা সাধারণ জওয়ানদের ভীতি প্রদর্শন করে সশস্ত্র হতে ও বিদ্রোহে অংশ নিতে প্ররোচিত করতে পেরেছিল। কিন্তু বিদ্রোহের শুরুতেই যদি তাদের দমিয়ে দেয়া যেত তাহলে ঘটনা এতটা ভয়াবহ ও নৃশংসের পর্যায়ে যেতে পারত না বলেই সমরবিদরা সুস্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
সরকার বর্তমান দুঃসময়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বদলে বিরোধী দলকে নানাভাবে অভিযুক্ত করার পুরনো কৌশলই অবলম্বন করে চলেছে। কিন্তু জনগণের কাছে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। ২০০৬-০৭ সালে আওয়ামী লীগের ডেকে আনা এক অসাংবিধানিক স্বৈরাচারী তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশকে বিরাজনীতিকরণের যে ভয়াবহ খেলায় মেতে উঠেছিল বর্তমান সরকারও সে রকম নিকৃষ্ট কৌশলই অবলম্বন করছেন বলে মনে হয়। দেশকে রাজনীতিশূন্য করার এক রাষ্ট্রঘাতী পথে অগ্রসর হতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে। কূটনীতিকে ভারতমুখী করেছে। প্রভুদের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে কৃষি, শিল্পসহ সব খাতের বিনাশ ডেকে এনেছে, লাখ লাখ মানুষকে কর্মহীন করেছে। প্রায় দেড় কোটি মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিয়েছে। একটাই অপকর্মের অপপ্রয়াস দেশকে নিঃরাজনীতিকরণ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সে ইতর প্রয়াস সফল হয়নি। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, রাজনীতিকরা ওই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবেন। অন্তত এটুকু শিক্ষা নেবেন, রাজনীতি থাকতে হবে রাজনীতিকদের হাতে। কিন্তু তারা সেই শিক্ষা নিয়েছেন বলে মনে হয় না। পিলখানায় সেনাকর্মকর্তাদের ওপর গণহত্যা চালানোর ফলে শুধু যে সেনাবাহিনী দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এরকম পরিস্থিতিতে দরকার ছিল সব রাজনৈতিক দলের দেশের সর্বস্তরের প্রতিটি মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। কিন্তু সরকারও যেন তাদের পূর্বসূরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কায়দায় একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে যাচ্ছে।
২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহ দমনে কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার বিরোধী দলের সাথে কোনোরূপ পরামর্শ করার প্রয়োজনবোধ করেনি। বরং এ প্রশ্ন উত্থাপিত হলে অনেকটা শ্লেষের সুরে প্রমানমন্ত্রী বলেছেন, এটা তার ছেলে বা মেয়ের বিয়ে নয় যে কাউকে দাওয়াত করে নিয়ে আসতে হবে। সেনাবাহিনীর প্রতি দরদ থাকলে বিরোধী দল নিজে নিজে এগিয়ে আসত। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হলে সরকারকে একা কোনো কিছুর দায়ভার বহন করতে হতো না। সরকারকে কেউ এককভাবে দোষারোপ করার সুযোগও পেত না।
কিন্তু সে পথে যায়নি সরকার। বরং তিনি বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এ দেশে গৃহযুদ্ধ বাধানোর ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কিন্তু আমরা নানামুখী তৎপরতার মাধ্যমে জিম্মি ও তাদের পরিবারকে রক্ষার পাশাপাশি দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছি। আর যারা এ ঘটনার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে হাজার হাজার মানুষের লাশ চেয়েছিল, গৃহযুদ্ধ বাধাতে চেয়েছিল তাদের ষড়যন্ত্র সফল না হওয়ায় এখন নানাভাবে উসকানি দিচ্ছে। তিনি বলেন, জানি পরাজয়ের জ্বালা অনেক, কিন্তু সেই যন্ত্রণার আগুনে দেশের মানুষকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারার ষড়যন্ত্র কেনো? এটাই আমার প্রশ্ন।
বাংলাদেশ গোত্র বিভক্ত দেশ নয়। এখানে গোত্রগত কোনো হানাহানি নেই। একই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এ জনপথের গোড়পত্তন থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে তাই কোনোদিন গৃহযুদ্ধের কোনো পরিবেশ ছিল না, এখনো নেই। প্রধানমন্ত্রী হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, পিলখানায় বিপথগামী বিদ্রোহীদের দমনে সেনা অভিযান চালালে সারাদেশেই বিডিআর ক্যাম্পগুলোতে বিদ্রোহের সূচনা ঘটত এবং তা থেকে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটত। এ আশঙ্কাও সম্পূর্ণ অমূলক। পিলখানায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পর সারাদেশে বিডিআর বিদ্রোহ ঘটলে জনগণের কোনো অংশই বিডিআর জওয়ানদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতো বলে মনে হয় না। আর জনগণের সক্রিয় সমর্থন না পেলে গৃহযুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। তা ছাড়া বাংলাদেশের ভূখণ্ডই এমন যে এখানে বনেবাদাড়ে লুকিয়ে থেকে জনগণের সমর্থন ছাড়া গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনাও অসম্ভব ব্যাপার। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী যে গৃহযুদ্ধের কথা বলছেন সেটা বাংলাদেশে কখনোই সম্ভব নয়। আর সেই কল্পিত গৃহযুদ্ধের দায়ভার তিনি চাপানোর চেষ্টা করছেন বিরোধী দলের ওপর।
বাংলাদেশে যদি সত্যি সত্যি কোনোদিন এ ধরনের সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাহলে সেই পরিস্থিতি থেকে কি সরকার, কি বিরোধী দল কেউই কোনোরূপ ফায়দা আসিল করতে পারবে না। বাংলাদেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত মানুষ স্বজন পরিবেষ্টিত। যিনি টেকনাফ থাকেন তার আত্মীয়তা আছে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। যিনি কুমিল্লা থাকেন তার আত্মীয়স্বজনের অনেকে যশোরের বাসিন্দা এভাবেই ছড়িয়ে ছটিয়ে আমাদের বসবাস।
তাই বাংলাদেশে যদি ‘গৃহযুদ্ধ’ সত্যি সত্যি কোনোদিন বাধানো যায়, তবে তার ফায়দা লুটবে অন্য কোনো দেশ। যারা পদানত করতে চায় বাংলাদেশকে। হীনবল করতে চায় আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীকে। যারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করতে তুলতে চায়। প্রধানমন্ত্রী যদি তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলকে পাশে রাখতেন তাহলে দেশের এই ঘোর বিপদের দিনে তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিতে পারতেন। তার এই বিভেদের ভেদরেখা সে সুযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছে।
লেখকঃ সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট (সুত্র,নয়া দিগন্ত, ১৬/০৩/২০০৯)
Sunday, 22 March 2009
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
.jpg)

No comments:
Post a Comment